সোমবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

কুরবানীর গোশত

কুরবানীর গোশত 
১. কুরবানীর গোশত কুরবানীদাতা ও তার পরিবারের 
সদস্যরা খেতে পারবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন : 
﴿ ﻓَﻜُﻠُﻮﺍْ ﻣِﻨۡﻬَﺎ ﻭَﺃَﻃۡﻌِﻤُﻮﺍْ ﭐﻟۡﺒَﺎٓﺋِﺲَ ﭐﻟۡﻔَﻘِﻴﺮَ ٢٨ ﴾ [ ﺍﻟﺤﺞ: ٢٨ ] 
‘অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ, 
অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।’ [সূরা আল-হজ্জ: ২৮] 
২. উলামায়ে কিরাম বলেছেনঃ কুরবানীর গোশত তিন ভাগ 
করে একভাগ নিজেরা খাওয়া, এক ভাগ দরিদ্রদের দান 
করা ও এক ভাগ উপহার হিসেবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব 
ও প্রতিবেশীদের দান করা মুস্তাহাব। 
৩. কুরবানীর গোশত যতদিন ইচ্ছা ততদিন সংরক্ষণ 
করে খাওয়া যাবে। কুরবানীর গোশত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ 
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 

« ﻛُﻠُﻮﺍ ﻭَﺃَﻃْﻌِﻤُﻮﺍ ﻭَﺍﺩَّﺧِﺮُﻭﺍ » 

“তোমরা নিজেরা খাও ও অন্যকে আহার করাও 
এবং সংরক্ষণ কর।” [সহীহ আল-বুখারী : ৫৫৬৯] 
৪. কুরবানীর পশুর গোশত, চামড়া, চর্বি বা অন্য 
কোনো কিছু বিক্রি করা জায়েয নেই। কসাই বা অন্য 
কাউকে পারিশ্রমিক হিসেবে কুরবানীর গোশত 
দেওয়া জায়েয নয়। হাদিসে এসেছে : 
« ﻭَﻟَﺎ ﻳُﻌْﻄِﻲَ ﻓِﻲ ﺟِﺰَﺍﺭَﺗِﻬَﺎ ﺷَﻴْﺌًﺎ » 
‘আর তা প্রস্তুতকরণে তা থেকে কিছু 
দেওয়া হবে না।’ [বুখারী -১৭১৬] 
তবে দান বা উপহার হিসেবে কসাইকে কিছু দিলে তা না- 
জায়েয হবে না।

প্রথম ভৌতিক অভিজ্ঞতা

সেদিন ছিল আমার এক জিগরী দোস্ত সুব্রতর জন্মদিন, কিন্তু কোথায় ব্যাটাকে জন্মদিনের শূভেচ্ছা জানাবো আর একটু গুলতানি করব(সেইসাথে পেটপুজোর কথা ভুললে চলবে না) - সেখানে কিনা তিনি ফোন বন্ধ করে বসে আছেন। মেজাজ খারাপ করে মনে মনে যখন 'শ’খানেক ছাপার অযোগ্য গালি দিয়ে ফেলেছি তখনি মহাশয়ের ফোন। ফোনেই বিস্তারিত জানা গেল, এই শুভদিনে নাকি বেচারার টাকা-পয়সার বেজায় অভাব। আবার পাড়ায় জনপ্রিয় হওয়ার ঠেলা সামলাতে হচ্ছে এখন - পাড়ার পোলাপান নাকি এক হপ্তা আগে থেকেই ঝুলোঝুলি করছে জন্মদিনের দিন ভূরিভোজ করাতে হবে। ওদিকে পকেটের স্ট্যাটাস তো আশরাফুলের অ্যাভারেজের থেকেও খারাপ। এমতাবস্থায় পাড়ার জনপ্রিয় সুব্রতদা ইজ্জত আব্রু রক্ষার্থে ভোরে কাকচিলের ঘুম ভাঙার আগেই বাড়ি থেকে চম্পট দিয়েছেন ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের উদ্দেশ্যে। সেখানেই তার জন্মদিনের হদিশ জানে না এমন কিছু দূরসম্পর্কীয় আবাল বন্ধূবান্ধবের সাথে আড্ডা মেরে কালাতিপাত করছেন। বাসায় বলে এসেছেন জরুরী কাজে সারাটা দিন বাইরে থাকবেন আর পোলাপানের যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে ফোন নামক যন্তরটারও গলা টিপে ধরে রেখেছিলেন এতটাখন। গরম মেজাজ খানিকটা ঠান্ডা হল কিন্তু তবুও রাগ গেল না, জানতে চাইলাম তাহলে এখন কি এমন মহাগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে যে আমার মতো অধম বন্ধুবরটির কথা তেনার ব্যস্ত মনে উদয় হলো? না খাওয়ানোর পার্টিতে কি আমার নামটাও ধরেন নি? মুখপোড়া ব্যাটা জানান দিল, না খাওযানোর ব্যাপারটা নাকি আমি ঠিকই ধরতে পেরেছি! যাহোক প্রতি জন্মদিনেই নাকি এই স্বঘোষিত “নাস্তিক”টি কালীমাতাকে ভোগ দেয়, তাই এবারও এই নিয়মটির ব্যত্যয় ঘটাতে মন চাইছে না। পরম সৌভাগ্যের বিষয় যে ময়নামতির মতো জনবিরল এলাকোতেও একটা ছোট্ট কালীমন্দিরের হদিশ পাওয়া গিয়েছে - কিন্তু একা যেতে মন চাচ্ছে না বলেই আমাকে স্মরণ করা। জন্ম নিয়েইতো কালী দেবীর অনেক দূর্ভোগ ডেকে এনেছিস আবার পুজো দিয়ে সেটা জানান দেবার মানে টা কি - ইত্যাদি ইত্যাদি গজগজ করতে করতে রাজি হলাম; সত্যি কথা বলতে কি এই প্রস্তাব পেয়ে বেশ খুশীই হয়েছিলাম - ছুটিতে বাসায় বিনাশ্রম কারাদন্ড ভোগ করবার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে দুদন্ড বাইরের হাওয়া বাতাস গায়ে লাগালে খুব একটা মন্দ হয় না। তাই কোনমতে গায়ে ভদ্রস্থ একটা কাপড় চড়িয়ে ছুট রাগালাম।
গিয়ে দেখলাম বাবু একটা বিরান মাঠে বসে মনের সুখে বিড়ি টানছেন, রোজদার মানুষ চাইতেও পারি না; মনটা আরো তিতকুটে হয়ে গেল। তবে ওর হাতে বড় একটা মিষ্টির প্যাকেট দেখে একটু শান্ত হলাম - দেবীই নিশ্চয়ই সব খাবেন না আমারও কিছু প্রসাদ মিলবে। যখন পৌছলাম তখনি ইফতারের সময় হয় হয়, কাজেই রাস্তায় ইফতার সেরে বেরুতে বেরুতে পুরোপুরি অন্ধকার নেমে এল। আর মাঠের দিকে তাকিয়ে তো আমার চোখ ঐ মিষ্টির প্যাকেটেরই রসগোল্লার মতো গোলগোল হয়ে গেল - দেখে মনে হচ্ছে মাঠের দুশ্যটার ওপর কোন অদৃশ্য হাত মনের সুখে ভুষোকালি মাখিয়েছে। একি সর্বনাশ! এক হাত দূরের জিনিসও ঠাহর করা যাচ্ছে না। কাটা ঘায়ে মরিচবাটা দেওযার মতো করেই সুব্রত হাসিমুখে জানাল এই তেপান্তরের মাঠ পেরিয়েই নাকি ঐ মন্দির দর্শন করতে হবে, বেশ দূরেই কালীদেবীর ঐ নিবাস কাজেই তাড়াতাড়ি রওনা দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। দেরী হলেই বা কি হল, এর থেকে বেশি অন্ধকারতো আর হতে পারে না, এই ভাবতে ভাবতে হঁাটতে লাগলাম। অমাবশ্যা না হলেও সেদিন আকাশে চাঁদ মামা তার ভাগ্নেদের দেখা দিলেন না, ভাগ্যে সুব্রত বুদ্ধি করে একটা টার্চ এনেছিল, কিন্তু এই আঁধারের মহাসমুদ্রে ঐ ছোট্ট টর্চটা তার সর্বশক্তি দিয়েও আমাদের সামনের পা ফেলার জায়গাটা ছাড়া আর কিছুই দেখাতে পারছে না। আকাশের চাদোঁয়াতে মিটমিটে দুটো তিনটে তারার উপস্থিতিতে আবছা আবছা বড় গাছগাছালির ছায়া দেখা যাচ্চে এই যা। পুরোপুরি গা ছমছমে পরিবেশ। আমরা এসব খেয়াল না করে নিজেদের মাঝে কথা বলছি, হাজার হলেও অনেকদিন পর দেখা। আড্ডা মারতে মারতে কয়েক ঘন্টা কি দিন চলে গেল বলতে পারবো না, শুধু মনে হচ্ছিল অনন্তকাল ধরে হাটছি আর হাটছি। হাঁটতে হাঁটতে একসময় এমন একটা জায়গায় পৌছালাম যেখানে রাস্তার দুপাশে দুটো হুবহু একই আকৃতির দুটো গাছ(সম্ভবত আমগাছ) সান্ত্রীর মতো দাড়িয়ে আছে। গাছ দিয়ে তৈরী প্রাকৃতিক ঐ গেটের নিচে পৌছাতেই হঠাৱ সুব্রত বলল ঐতো মন্দিরটা ... আর তার কথা শেষ হতেই আমি ঘন্টার আওয়াজ শুনলাম স্পষ্ট - টং ... টং ... টং পরপর তিনবার বাজতেই আমি সুব্রতকে জিজ্ঞেস করলাম মন্দিরে পুজো হচ্ছে নাকি? বলামাত্রই ঘন্টার আওয়াজ থেমে গেল। সুব্রত জানাল সে নাকি কিছুই শোনে নি, আর তাছাড়া মন্দিরের পুরুতমশাই সন্ধ্যার আগে আগেই মন্দিরের বাতি জ্বালিয়ে বাড়ি চলে যান - জায়গাটা এমনই নির্জন যে মন্দিরের আশে পাশে দুএক কিলোমিটারের মাঝে মনে হয় কোন জনবসতি নেই - কাজেই আমার ঘন্টার আওয়াজ শোনার কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই। আমি কোন কথা না বলে মেনে নিলাম, কিন্তু ঘন্টার আওয়াজ শূনেছি এতে কোন ভুল নেই - হয়তোবা বাতাসেই মন্দিরের ঘন্টা বেজে উঠেছে(যদিও পবনদেবের টিকিটরও দেখা পাওয়া যাচ্ছে না তবুও মনকে সান্ত্বনা দেওয়া)। যাহোক তর্ক না বাড়িয়ে আলোটার দিকে দুজনে এগোলাম। মন্দিরের কাছে পৌছে দেখলাম সুব্রতর কথাই ঠিক, গেটে বিশালাকারের তালা ঝুলছে আর চারদিকে কোন মানবসন্তানের চিহ্নও নেই, ভেতরে টিমটিমে একটা ৬০পাওযারের বাল্ব তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে মহাকষ্টে। কিন্তু পুজো তো দিতেই হবে, অগত্যা টারজান গিরি ফলিয়ে দেয়াল টপকে দুজনে ভিতরে ঢুকলাম। সুব্রত যখন পুজো দিচ্ছিল তখন আমি ঘুরে ঘুরে দেখলাম মন্দিরখানা, কিন্তু যেখানে ঘন্টা থাকার কথা সেখানে কোন ঘন্টার হদিশ নেই! সম্ভবত পুরুতমশাই তালাখানার ওপর ভরসা করতে না পেরে বাড়িতে নিয়ে গেছেন। তাহলে আসলেই কি ঘন্টার আওয়াজ শুনেছি না মনের ভূল? সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে প্রসাদের মিস্টিগুলো সাবাড় করলাম দুজনে মিলে। উদরপূর্তি শেষ করে যখন উঠলাম তখন অসম্ভব মনে হলেও বাইরের অন্ধকার আরো গাঢ় মনে হচ্ছে - কিন্তু সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, এখন আর শিশিরে ভয় করে লাভ কি? তাড়াতাড়ি দুবন্ধু পা চালালাম। দুজনের মুখে এখন আর কথা নেই, ঘরের ছেলে ভালমত ঘরে ফিরতে পারলে বাঁচি। এবার আবার যখন সেই দুটো গাছের তোরণের নিচে এসে পৌছালাম ঠিক ঐ মুহুর্তেই আবারো একইরকম ঘন্টাধ্বনি শোনা গেল .... টং ... টং ... টং ... টর্চের আলোয় যতটুকু মুখ দেখা যাচ্ছিল তা দেখেই আমি বুঝলাম এবার সুব্রতও শুনতে পেরেছে। তবুও আমি বললাম “এবার বিশ্বাস হয়েছেতো?” আমার মুখ থেকে কথাগুলো বের হওয়ামাত্রই ঘন্টাধ্বনি থেমে গেল ঠিক আগেরমতো - চারদিক এখন কবরস্থানের মতো নীরব, এর মাঝে মূর্তির মতো দাড়িয়ে আছে দুজন হতচকিত যুবক। কতক্ষণ জানি না, তবে বেশ খানিক্ষণ ঐভাবেই দাড়িয়েছিলাম আমরা - কিন্তু সেই ঘন্টার আওয়াজ আর শোনা গেল না। কোন কথা না বলে দ্রুতপায়ে ফেরত আসলাম আমরা।<p> </p><p>পরদিন দিনের বেলায় একই জায়গায় গিয়েছিলাম, খুবই সাধারণ একটা জায়গা। কিন্তু এ কথা সত্য যে মন্দিরের মাইলখানেকের মাঝে কোন জনবসতি নেই, এবং সন্ধ্যার পর পুরুতমশাই ঘন্টাখানা বগলদাবা করে বাড়ি ফেরেন সেটাও সত্য। তাহলে আমরা যে ঘন্টাধ্বনি শুনলাম তা কোথা থেকে আসলো?? এখন হাস্যকর লাগছে ব্যাপারটা কিন্তু তখন হয়তো পরিবেশের কারণেই ভয় না পেলেও বেশ চমকে গিয়েছিলাম। ভূত-প্রেত, জ্যোতিষী, হোমিওপ্যাথি আর বাংলাদেশের নেতা এই চারটি বস্তুর ওপর অবিশ্বাস জ্ঞান হবার পর থেকেই। এবং এ ঘটনাও কিন্তু সেই অবিশ্বাসের ভিতকে নাড়াতে পারে নি। তবুও কেন ঘন্টাধ্বনি শুনলাম এ ব্যাপারে আর খোঁজখবর করি নি, থাক না কিছু জিনিস রহস্য হয়ে। কারণটা জেনে ফেললে তো আর এটা আমার জীবনের প্রথম ভৌতিক অভিজ্ঞতার মর্যাদা পাবে না!!

কুরআন যে কারণে মহাবিস্ময়


মিসরের পিরামিড ও ভারতের তাজমহলসহ পৃথিবীতে রয়েছে বহু বিস্ময়কর দর্শনীয় স্থান, যা দেখে পর্যটকমাত্রই বিস্ময়ে অভিভূত হয় । এক কালের মার্কিন ফার্স্টলেডি হিলারি কিনটন তাজমহল দেখে আফসোস করে বলেছিলেন, আহ! আমি যদি এখানে থাকতে পারতাম! কুরআনে কারিমের বিস্ময়কারিতা দুনিয়ার সব বিস্ময়ের ওপরে। আধুনিক যুগের সবচেয়ে জ্ঞানী ও প্রভাবশালী লোকটি যদি কুরআনের গভীর জগতে পৌঁছতে পারে, তবে অবশ্য মনের অজান্তেই বলবে যে, আহ! যদি আমার জীবন কুরআনের মতো হতো! প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ সা: একবার নাখলা নামক স্থানে ফজর নামাজে কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন। শত শত বছরের বয়স্ক একদল জিন তা শুনে বলেছিল, আজ আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি (সূরা জিন-০১)। কুরআন আশ্চর্যজনক তো অবশ্যই! কেননা, কুরআনে কারিম হেদায়াত আর জ্ঞান-বিজ্ঞান দিয়ে ভরপুর এক অতল মহাসমুদ্রের মতো। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পৃথিবীর সমুদয় বৃ যদি কলম হয় এবং এ সমুদ্রের সাথে সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে যদি কালি হয় তবুও তার বাণীগুলো লিখে শেষ করা যাবে না (লুকমান-২৭)। মহানবী সা: বলেন, ‘কুরআনের আশ্চর্য ধরনের বিস্ময়কারিতা কখনো শেষ হবে না, এটি কোনো দিন পুরান হবে না। কুরআনে রয়েছে হেদায়াতের মশাল ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুউচ্চ মিনার’ (তাফসিরে সাঈদী)।কুরআনের রচনা অনন্য অদ্বিতীয়। এটি অপূর্ব ভাববিজড়িত আশ্চর্য শব্দবিন্যাস ও বহুমাত্রিক চমৎকারিত্বসম্পন্ন বাক্যসংবলিত এক অমূল্য সম্পদ। কুরআন নাজিলের যুগ ছিল সাহিত্যের যুগ। তখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকেরা ছিলেন আরবেই। প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ শ্রেষ্ঠ কবিতা ও রচনাকে কাবাঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে গর্ব করা হতো। আল্লাহ তায়ালা তাদের বলেন, ‘আমার বান্দার প্রতি যা নাজিল করেছি তাতে তোমাদের যদি কোনো সন্দেহ হয় তবে এর মতো ছোট্ট একটি সূরা রচনা করে নিয়ে এসো’ (বাকারা-২৩)। যুগশ্রেষ্ঠ ওই সব সাহিত্যিকও কুরআনের সমমানের ছোট্ট একটি সূরা রচনা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হন। ৭২৭ সাল। ইরানের কিছু পথভ্রষ্ট লোক ল করল যে, দেশের আপামর জনতা কুরআনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ আকর্ষণ থেকে লোকদের ফেরানোর উদ্দেশ্যে কুরআনের অনুরূপ গ্রন্থ রচনার জন্য দেশের প্রতিভাসম্পন্ন, ধীশক্তির অধিকারী ও প্রখ্যাত সাহিত্যিক ইবনে মুকাফ্ফাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধার লোভে কাগজ কলম নিয়ে তিনি নিজের গবেষণালয়ে বসে যান। ছয় মাস পর দরজা খুলে দেখা গেল ইবনে মুকাফ্ফা ঘর্মাক্ত দেহে গভীর ধ্যানে মগ্ন। চার পাশে ছেঁড়া কাগজের বড় বড় স্তূপ। তাকে ডেকে অর্পিত কাজের খোঁজ নিলে তিনি বললেন, দেশবাসী! ছয় মাস চলে গেল অথচ আমি কুরআনের অনুরূপ একটি বাক্যও রচনা করতে পারিনি। যতবার চেষ্টা করেছি ততবার ব্যর্থ হয়ে লিখিত কাগজ ছিঁড়ে কাগজের বড় বড় স্তূপ বানাতে পেরেছি। ব্যর্থতার গ্লানি মাথায় নিয়ে লজ্জিত হয়ে তোমাদের দেয়া এ প্রকল্প ত্যাগ করলাম।
কুরআন তেলাওয়াতের সুর বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহ-প্রদত্ত বিস্ময়কর উপহার। মর্মস্পর্শী এর আওয়াজ শ্রোতাকে অবাক করে দেয়। পৃথিবীর কোনো ধর্মগ্রন্থের এ বৈশিষ্ট্য নেই। এর তেলাওয়াতে আকাশ থেকে ফেরেশতা নাজিল হয়। হজরত উসাইদ বিন হুজাইর রা: এক রাতে কুরআন তেলাওয়াত করতে থাকলে আকাশ থেকে একদল ফেরেশতা অবতরণ করে (বুখারি)। কুরআন তেলাওয়াত একটি ইবাদত, আর ইবাদতের গতি ঊর্ধ্বমুখী। তাই পৃথিবীর কোনো আওয়াজ আকাশমুখী না হলেও মুসলমানদের কুরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ আকাশমুখী হয়ে থাকে। ১৯৬৯ সালের ২১ জুন অ্যাপোলো-১১ তে চড়ে নীল আর্মস্ট্রং, অলড্রিন ও কলিন্স চাঁদে অবতরণ করেন। নিল আর্মস্ট্রং সেখানে বহু আওয়াজ শোনেন এবং তা রেকর্ড করেন। পৃথিবীতে এসে ওই রেকর্ড প্লে করলে প্রমাণিত হয় যে, তা মুসলমানদের আজান ও নামাজে কুরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ। মিসর সফরে এসে তিনি ওই রূপ আজানের সুর শোনেন এবং তাতে প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণীতে রয়েছে বিস্ময়কর বাস্তবতা। স্বয়ং কুরআনের ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘আমি এই উপদেশগ্রন্থ নাজিল করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক’ (হিজর-৯)। এটি নাজিল থেকে ১৪শ’ বছর পার হয়ে গেল অথচ কুরআনের একটি বর্ণও হারিয়ে বা পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়নি। সংরণপদ্ধতির একটি এটিও হতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালা কুরআনকে সহজ করে দিয়েছেন। তাই কোনো ধর্মগ্রন্থের হাফেজ না থাকলেও এক জরিপ মতে, পৃথিবীতে কুরআনের হাফেজের সংখ্যা ছয় কোটির ওপরে। সূরা হিজরের ৯ নম্বর আয়াতের প্রতি দুঃসাহসী চ্যালেঞ্জ করেছিল তুরস্কের একদল অবসরপ্রাপ্ত মেজর ও ক্যাপটেন। তারা সাগরে একটি জাহাজে অর্ধনগ্ন নর্তকীদের দ্বারা আনন্দ কনসার্টের আয়োজন করে এবং ওই আয়াত সংবলিত পৃষ্ঠা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে নর্তকীদের পায়ের নিচে ছিটিয়ে দেয়। সাথে সাথে আল্লাহর গজব নেমে আসে এবং কুরআনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখে এমন একজন ছাড়া বাকি সবাই ধ্বংস হয়। সূরা ইউসূফের ৯২ নম্বর আয়াতে ফেরাউনের লাশ অত রাখার ঘোষণা এসেছে। সে অনুযায়ী ১৮৯৮ সালে লাশটি আবিষ্কার হয়ে অদ্যাবধি অত অবস্থায় রয়েছে। সূরা রূমের ১ ও ২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কয়েক (১০) বছরের মধ্যেই পারস্যের উপর রূমের বিজয় হবে। আর ঠিকই ১০ বছরের মধ্যে পারস্যের ওপর রূমের বিজয় হয়। এ ছাড়াও আরো অনেক ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, যা যথাসময়ে বাস্তবায়িত হয়েছে ।কুরআনের গাণিতিক বিস্ময়কারিতা আরো চমকপ্রদ। বিসমিল্লাহতে ১৯টি বর্ণ আছে। এ ১৯ সংখ্যাটি দ্বারা কুরআনের বিভিন্ন শব্দ বা বর্ণের যোগফলকে ভাগ করলে নিঃশেষে বিভাজ্য হবে। যেমন ‘ইসিম’ শব্দটি কুরআনে এসেছে ১৯ বার। এখন ১৯/১৯=১ অর্থাৎ নিঃশেষে বিভাজ্য। ‘আল্লাহ’ এসেছে ২৬৯৮ বার। ২৬৯৮/১৯=১৪২। ‘রাহমান’ শব্দ এসেছে ৫৭ বার। ৫৭/১৯=৩। ‘রাহিম’ শব্দটি এসেছে ১১৪ বার। ১১৪/১৯=৬। সূরা নূনে ‘নূন’ বর্ণটি এসেছে ১৩৩ বার। ১৩৩/১৯=৭। সূরা ক্বফে ‘ক্বফ’ বর্ণটি এসেছে ৫৭ বার, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য। সূরা আরাফে ‘আলিফ লাম মিম সোয়াদ’ এ বিচ্ছিন্ন হরফগুলো ওই সূরায় যতবার এসেছে এর সমষ্টি ৫৩২০, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য।আবার কুরআনে এমন কিছু শব্দ আছে যা একটির বিপরীতে অন্য আরেকটি শব্দ সমভাবে বিদ্যমান। পুরুষ বা রিজাল শব্দ এসেছে ২৪ বার, বিপরীতে নারী বা ইমরাহ শব্দটিও এসেছে ২৪ বার। জীবন বা হায়াত শব্দটি ১৪৫ বার, বিপরীতে মৃত্যু বা মউত শব্দটিও এসেছে ১৪৫ বার। দুনিয়া শব্দটি ১১৫ বার, বিপরীতে আখিরাত শব্দটিও ১১৫ বার। ফিরিশতা শব্দটি ৮৮ বার, বিপরীতে শয়তান শব্দটিও ৮৮ বার। ১২ মাসে এক বছর। তাই শাহর বা মাস শব্দটিও এসেছে ১২ বার। ৩৬৫ দিনে এক বছর। তাই দিন বা ইয়াউম শব্দটিও এসেছে ৩৬৫ বার। এ ছাড়া কুরআনে আরো অনেক সংখ্যাতথ্য রয়েছে।পরিশেষে বলা যায়, টাইটানিক জাহাজ যখন ডুবছিল তখন ক্যাপটেন পিএস এলিয়ট এ বিপদ থেকে মুক্তির ল্েয চিৎকার করে বলছিল, PRAY FOR US NOW, WE ARE AT THE TIME OF OUR DETH। আজকের মানবজাতিও যেন মদ, জুয়া, গুম, খুন, চুরি, ডাকাতি, সুদ, ঘুষ, ব্যভিচার, অত্যাচার, অবিচার ও স্বৈরাচারের বিপদ সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে। বাঁচার আর্তনাদ করছে। তাদের উদ্ধারে কে এগিয়ে যাবে? হ্যাঁ, কুরআনধারী মুসলিম জাতি তথা মুসলিম যুবকদেরই এগিয়ে যেতে হবে। কেননা, তারাই সর্বোত্তম জাতি ও সর্বোত্তম উদ্ধারকর্মী। নিমজ্জমান এ জাতির সামনে কুরআন নামের এ শক্ত রশিটি ধরে বলতে হবে, মুক্তি পেতে হলেÑ ‘তোমরা আল্লাহর রশিকে ঐক্যবদ্ধভাবে শক্ত করে ধরো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়োনা’ (ইমরান-১০৩)।কুরআনে রয়েছে চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য। আধুনিক বিজ্ঞান বলেছে যে, জীব সৃষ্টির মূল হচ্ছে ‘পানি’। অথচ ১৪ শ’ বছর আগেই কুরআন বলেছে, ‘আর প্রাণবন্ত সব কিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করেছি’ (আম্বিয়া-৩০)। বিজ্ঞান বলেছে, সৃষ্ট বস্তুর সব কিছুতে জোড়া জোড়া পদ্ধতি রয়েছে। অথচ ১৪ শ’ বছর আগেই কুরআনের সূরা ইয়াসিনের ৩৬ নম্বর আয়াতে তা বলা হয়েছে। গর্ভধানী বাতাসের তথ্য উল্লেখ আছে সূরা হিজরের ২২ নম্বর আয়াতে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির তথ্য উল্লেখ আছে সূরা মুরসালাতের ২৫ ও ২৬ নম্বর আয়াতে। পাহাড়গুলো যে পৃথিবীর পেরেক তা উল্লেখ আছে সূরা নাবার ৭ নম্বর আয়াতে। একসময় আকাশ ও পৃথিবী একসাথে থাকার তথ্য রয়েছে সূরা আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে। এ ছাড়া কুরআনে আরো প্রচুর পরিমাণে চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে, যার সাথে আধুনিক বিজ্ঞান মিলে যায়। সুতরাং কুরআন হলো সব নীতিমালার মূলনীতিগ্রন্থ যাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। এটিকে 'ENCYCLOPAEDIA OF KNOWLEDGE' Ges 'ALL IN ONE'ও বলা যায়। লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘নিউ ইস্ট’ পত্রিকায় বলা হয়েছে, ‘কুরআন হচ্ছে অতি বিস্ময়কর এক গ্রন্থ।’ আসলে এটি মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়। দরকার শুধু দেখার মতো চোখ, শোনার মতো কান ও বোঝার মতো মন।সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মাদ সা: এ কিতাবের মাধ্যমে এমন এক কাক্সিত সমাজ সৃষ্টি করেছিলেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্ববাসীর জন্য অনুকরণীয়। তিনি সা: বলেছেন, ‘আমার যুগই শ্রেষ্ঠ যুগ’ (মুয়াত্তা)। সে সমাজে রাতের গভীরে কোনো নষ্টা নারী কোনো মুসলিম যুবককে ডাকলে যুবক বলত, ‘না, আমি একজন মুসলিম। আমি আল্লাহকে ভয় করি’। মদ নিষিদ্ধ করা হলে দেশের সব জনগণ যার যার মদের মটকা রোডে নিয়ে ঢেলে দেয় ও মটকা ভেঙে ফেলে। কোনো লোক অপরাধ করলে নিজেই এসে আত্মসমর্পণ করত। সামাজিক অপরাধের পরিমাণ শূন্যের কোটায় নেমে গিয়েছিল। হজরত ওমর রা: এক বছর পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির আসনে অবস্থান করে বলেন, এ এক বছরে একটি মামলাও আমার আদালতে কেউ দায়ের করেনি।লেখক : প্রবন্ধকার, গ্রন্থকার ও লেকচারার

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৫

সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান এবং বাংলাদেশের শেখ মুজিব

সিঙ্গাপুর স্বাধীনতা লাভ করে ৩১’শে আগষ্ট ১৯৬৩ সাল। কিন্তু ১৯৫৯ সাল থেকে তারা স্বাধিকার লাভ করে। আমাদের যেমন শেখ মুজিব তাদের তেমনি লি কুয়ান ইউ। তাকে অবশ্য শেখ মুজিবের মত জীবনের দুই দশক জেলে কাটাতে হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর ব্রিটিশরা একে একে তাদের উপনিবেশগুলো ত্যাগ করছিলো। । রাজনৈতিক ব্যাস্ততা এবং কর্মসুচি ছাড়া তাকে তেমন ঝামেলা পোহাতে হয়নি।
লি কুয়ান ১৯৫৯ সালে স্বাধিকার অর্জনের প্রথম দিনটি থেকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী। টানা ৩০ বছর শাসন করেছেন তিনি। গণতন্ত্র কি খায় না মাথায় দেয় তার শাসনামল শেষ হবার আগ পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের মানুষ জানতে পারেনি। তারা চেয়েছিলো বলেও মনে হয় না। মাঝেমধ্যে কিছু প্রতিবিপ্লবী এবং অতি বিপ্লবীরা গণতন্ত্র, ভোটের অধিকার চাইলেও তাদের ঠিকানা হয়েছে হয় মাটির তলে, নয়তো সমুদ্রে মাছের খাদ্য হয়ে অথবা লাল দালানের ভাত খেয়ে। সিঙ্গাপুর যখন স্বাধীনতা অর্জন করে তখন তার সম্পদ বলতে একটি সামুদ্রিক বন্দর এবং সামুদ্রিক মাছ। চরম  দরিদ্র অবস্থা। সে তুলনায় একাত্তরের যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ছিলো ঢের বেশী। হেনরি কিসিঞ্জার তখনকার বাংলাদেশকে বলেছিলেন তলাবিহীন ঝুড়ি। সিঙ্গাপুরের তলা দূরে থাক। ঝুড়িটাও ছিল না স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে।
স্বাধীনতার পরপর সিঙ্গাপুরের মানুষ বছরের পর বছর অভাব, কষ্ট সহ্য করেছে। সাথে ছিল ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া কলোনিয়াল সিস্টেমের উচ্ছিষ্ট। যার দরুন সুশাসন এবং দুর্নীতির প্রকোপ। ঠিক যেমনটা আমরা দেখেছি আমাদের জাতির স্বাধীনতার পরে। তাতে লি কুয়ান দমে যাননি। দমে যায়নি তার অনুসারীরাও। দাঁতে দাঁত চেপে প্রায় দুই দশকের পরিশ্রমে তারা দুর্নীতি, অভাব সবকিছুকে ঝাঁটাপেটা করে বিদায় করে। তিন দশকের মাথায় লি কুয়ান সিঙ্গাপুরকে পরিনত করেন এশিয়ার অন্যতম ধনী দেশ হিসেবে। এখন সিঙ্গাপুর মাথা পিছু আয়ের দিক থেকে পুরো পৃথিবীতে দ্বিতীয়। তাদের সমদ্র বন্দর বিশ্বের সবচাইতে ব্যাস্ততম বন্দর। তেল শোধনে সিঙ্গাপুর বাঘা বাঘা দেশকে পেছনে ফেলে তৃতীয়।
উল্টোদিকে, যদি আমাদের স্বাধীনতার পরের ইতিহাস দেখি তবে যেন শুরুটা একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। সেই অভাব, সেই দুর্নীতি আর সুশাসনের অভাব এবং কলোনিয়াল মানসিকতার যথেচ্ছাচার লুটপাট। আমাদের গল্পে অবশ্য স্বাধীনতা বিরোধীদের ভুমিকা আছে। যা সিঙ্গাপুরের গল্পে নেই। অতি বিপ্লবীরা অবশ্য ছিল। উনারা কবে কোথায় না ছিলেন। সিঙ্গাপুরের মানুষ জানতো লি কুয়ানের হাতে আলাদিনের চেরাগ নেই। শত বছরের শোষিত দেশের কাঠামো নতুন করে দাঁড় করাতে সময় লাগবে। তারা জানতো যে মানুষটা দেশের স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ, তিতীক্ষায় বিন্দুমাত্র অবহেলা করেননি তার চাইতে উপযুক্ত শাসক আর পাওয়া যাবে না। তাই লি কুয়ান যখন একদলীয় শাসন চালু করলেন যাবতীয় অবক্ষয় রোধে এবং বৃহত্তর স্বার্থে কেউ গণতন্ত্রের জন্য আমাদের মত স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে সুরে সুর মিলিয়ে মায়াকান্না করেনি।
লি কুয়ান যা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এর চাইতে উত্তম কাঠামো দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। সর্বদলীয়, সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহনে তৈরী করেছিলেন বাকশাল। তৎকালীন দ্বিতীয় বৃহত্তম দল সিপিবি হতে শুরু করে আরো অনেক দল যোগ দেয় তাতে। এমনকি অধুনা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান পর্যন্ত বাকশালের একজন গুরুত্বপুর্ন সদস্য ছিলেন। যদিও তার দলই পরবর্তীতে লুকিয়ে থাকা পরাজিত শক্তি এবং প্রাক্তন মুসলিম লীগারদের সাথে একত্রিত হয়ে নানা সময়ে বাকশালের নিন্দে-মন্দ করেছিলেন। এমনকি হাস্যকর হলেও সত্যি, এই সময়ে এসেও তারা সেই রাজনীতিটাই চালু রেখেছে।
লি কুয়ানের মানুষেরা গণতন্ত্র চায়নি। তারা আস্থা রেখেছিলো তাদের নেতার প্রতি। সন্তান যেমন আস্থা রাখে পিতার স্নেহ এবং ভালবাসার উপরে। অন্যদিকে আমাদের এখানে গণতন্ত্রের নামে কি-না হয়েছে। পাটের গুদামে আগুন হতে শুরু করে মানুষ খুন। এক সময়ে গণতন্ত্র উদ্ধার, দুর্নীতি মুক্ত করার নাম করে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলো খুনীরা। রেডিও’তে ঘোষনা আসলো- ফেরাউনের মৃত্যু হয়েছে। এবার আসমান থেকে আসমানী খাদ্যের মত করে উড়ে উড়ে ভাত ঘরে ঘরে ঢুকবে। ঘরে ঘরে হীরা, মানিক্য, মনি-মুক্তার বৃষ্টি বইবে। গণতন্ত্রের স্বর্নযুগ শুরু হবে। অথচ এই সেদিনও এক উত্তরাঞ্চলে মঙ্গায় মানুষ মারা গেছে অজস্র। কেউ একবার খোজও নেয়নি। যেন অনেকটাই মাথায় হাত বুলিয়ে...
এখন ২০১৫ সাল। শেখ মুজিবকে খুনের ৪০ বছর পার হয়ে যাবার পথে। হা হতোস্মি! ইলেকশনের দিন ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেও আমি জানি না আমার ভোট অন্য কেউ দিয়ে গেছে কিনা। ঘর থেকে বের হবার আগে চিন্তা করি রাতে কি অক্ষত দেহে এই ঘরে প্রবেশ করবো নাকি কয়লা। দুর্নীতি আগের চাইতে বেড়েছে। এই দেশের বাতাসও ঘুষ ছাড়া নড়ে না। অথচ, সিঙ্গাপুর? শুদ্ধ গণতন্ত্রের চর্চায় তারা পৃথিবীতে তিনে। দুর্নীতি নেই বললে চলে।
আমরা শেখ মুজিব বুঝি নাই। বুঝেছিলাম গণতন্ত্র। সিঙ্গাপুরের মানুষেরা গণতন্ত্র চায় নাই। চেয়েছিলো লি কুয়ান ইউকে। আজকে তাদের লি কুয়ান মারা গেছে। কিন্তু রয়ে গেছে শক্ত ভিতে দাঁড়ানো অর্থনীতি এবং গণতন্ত্র।
নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, শেখ মুজিবকে যারা খুন করেছিলো তারা মুখে বলেছিলো গণতন্ত্র এবং দুর্নীতির কথা। কিন্তু তারাই এই হত্যার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করেছিলো অদূর ভবিষ্যতেও যাতে বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতন্ত্রের চর্চা না হয়, দুর্নীতির সর্বগ্রাসী চেহারা যেন দিনে দিনে জমকালো হয়ে আমাদের গ্রাস করে নিচ্ছে। আজকে চারপাশে তাকাই আর হাহাকার করে বলি- হা শেখ মুজিব, হা জাতির পিতা! লি কুয়ান তার কাজ শেষ করে গেছে। তুমি পারনি। আমরা দেইনি। আজ আমরা নিষ্পাপেরাও তাই জীবন্ত নরকে জ্বলে পুড়ে মরছি।
Mehedi Hasan Rony
(Reporter Sahos24.com)

সিঙ্গাপুর স্বাধীনতা লাভ করে ৩১’শে আগষ্ট ১৯৬৩ সাল। কিন্তু ১৯৫৯ সাল থেকে তারা স্বাধিকার লাভ করে। আমাদের যেমন শেখ মুজিব তাদের তেমনি লি কুয়ান ইউ। তাকে অবশ্য শেখ মুজিবের মত জীবনের দুই দশক জেলে কাটাতে হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর ব্রিটিশরা একে একে তাদের উপনিবেশগুলো ত্যাগ করছিলো। । রাজনৈতিক ব্যাস্ততা এবং কর্মসুচি ছাড়া তাকে তেমন ঝামেলা পোহাতে হয়নি।
লি কুয়ান ১৯৫৯ সালে স্বাধিকার অর্জনের প্রথম দিনটি থেকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী। টানা ৩০ বছর শাসন করেছেন তিনি। গণতন্ত্র কি খায় না মাথায় দেয় তার শাসনামল শেষ হবার আগ পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের মানুষ জানতে পারেনি। তারা চেয়েছিলো বলেও মনে হয় না। মাঝেমধ্যে কিছু প্রতিবিপ্লবী এবং অতি বিপ্লবীরা গণতন্ত্র, ভোটের অধিকার চাইলেও তাদের ঠিকানা হয়েছে হয় মাটির তলে, নয়তো সমুদ্রে মাছের খাদ্য হয়ে অথবা লাল দালানের ভাত খেয়ে। সিঙ্গাপুর যখন স্বাধীনতা অর্জন করে তখন তার সম্পদ বলতে একটি সামুদ্রিক বন্দর এবং সামুদ্রিক মাছ। চরম  দরিদ্র অবস্থা। সে তুলনায় একাত্তরের যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ছিলো ঢের বেশী। হেনরি কিসিঞ্জার তখনকার বাংলাদেশকে বলেছিলেন তলাবিহীন ঝুড়ি। সিঙ্গাপুরের তলা দূরে থাক। ঝুড়িটাও ছিল না স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে।
স্বাধীনতার পরপর সিঙ্গাপুরের মানুষ বছরের পর বছর অভাব, কষ্ট সহ্য করেছে। সাথে ছিল ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া কলোনিয়াল সিস্টেমের উচ্ছিষ্ট। যার দরুন সুশাসন এবং দুর্নীতির প্রকোপ। ঠিক যেমনটা আমরা দেখেছি আমাদের জাতির স্বাধীনতার পরে। তাতে লি কুয়ান দমে যাননি। দমে যায়নি তার অনুসারীরাও। দাঁতে দাঁত চেপে প্রায় দুই দশকের পরিশ্রমে তারা দুর্নীতি, অভাব সবকিছুকে ঝাঁটাপেটা করে বিদায় করে। তিন দশকের মাথায় লি কুয়ান সিঙ্গাপুরকে পরিনত করেন এশিয়ার অন্যতম ধনী দেশ হিসেবে। এখন সিঙ্গাপুর মাথা পিছু আয়ের দিক থেকে পুরো পৃথিবীতে দ্বিতীয়। তাদের সমদ্র বন্দর বিশ্বের সবচাইতে ব্যাস্ততম বন্দর। তেল শোধনে সিঙ্গাপুর বাঘা বাঘা দেশকে পেছনে ফেলে তৃতীয়।
উল্টোদিকে, যদি আমাদের স্বাধীনতার পরের ইতিহাস দেখি তবে যেন শুরুটা একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। সেই অভাব, সেই দুর্নীতি আর সুশাসনের অভাব এবং কলোনিয়াল মানসিকতার যথেচ্ছাচার লুটপাট। আমাদের গল্পে অবশ্য স্বাধীনতা বিরোধীদের ভুমিকা আছে। যা সিঙ্গাপুরের গল্পে নেই। অতি বিপ্লবীরা অবশ্য ছিল। উনারা কবে কোথায় না ছিলেন। সিঙ্গাপুরের মানুষ জানতো লি কুয়ানের হাতে আলাদিনের চেরাগ নেই। শত বছরের শোষিত দেশের কাঠামো নতুন করে দাঁড় করাতে সময় লাগবে। তারা জানতো যে মানুষটা দেশের স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ, তিতীক্ষায় বিন্দুমাত্র অবহেলা করেননি তার চাইতে উপযুক্ত শাসক আর পাওয়া যাবে না। তাই লি কুয়ান যখন একদলীয় শাসন চালু করলেন যাবতীয় অবক্ষয় রোধে এবং বৃহত্তর স্বার্থে কেউ গণতন্ত্রের জন্য আমাদের মত স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে সুরে সুর মিলিয়ে মায়াকান্না করেনি।
লি কুয়ান যা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এর চাইতে উত্তম কাঠামো দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। সর্বদলীয়, সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহনে তৈরী করেছিলেন বাকশাল। তৎকালীন দ্বিতীয় বৃহত্তম দল সিপিবি হতে শুরু করে আরো অনেক দল যোগ দেয় তাতে। এমনকি অধুনা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান পর্যন্ত বাকশালের একজন গুরুত্বপুর্ন সদস্য ছিলেন। যদিও তার দলই পরবর্তীতে লুকিয়ে থাকা পরাজিত শক্তি এবং প্রাক্তন মুসলিম লীগারদের সাথে একত্রিত হয়ে নানা সময়ে বাকশালের নিন্দে-মন্দ করেছিলেন। এমনকি হাস্যকর হলেও সত্যি, এই সময়ে এসেও তারা সেই রাজনীতিটাই চালু রেখেছে।
লি কুয়ানের মানুষেরা গণতন্ত্র চায়নি। তারা আস্থা রেখেছিলো তাদের নেতার প্রতি। সন্তান যেমন আস্থা রাখে পিতার স্নেহ এবং ভালবাসার উপরে। অন্যদিকে আমাদের এখানে গণতন্ত্রের নামে কি-না হয়েছে। পাটের গুদামে আগুন হতে শুরু করে মানুষ খুন। এক সময়ে গণতন্ত্র উদ্ধার, দুর্নীতি মুক্ত করার নাম করে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলো খুনীরা। রেডিও’তে ঘোষনা আসলো- ফেরাউনের মৃত্যু হয়েছে। এবার আসমান থেকে আসমানী খাদ্যের মত করে উড়ে উড়ে ভাত ঘরে ঘরে ঢুকবে। ঘরে ঘরে হীরা, মানিক্য, মনি-মুক্তার বৃষ্টি বইবে। গণতন্ত্রের স্বর্নযুগ শুরু হবে। অথচ এই সেদিনও এক উত্তরাঞ্চলে মঙ্গায় মানুষ মারা গেছে অজস্র। কেউ একবার খোজও নেয়নি। যেন অনেকটাই মাথায় হাত বুলিয়ে...
এখন ২০১৫ সাল। শেখ মুজিবকে খুনের ৪০ বছর পার হয়ে যাবার পথে। হা হতোস্মি! ইলেকশনের দিন ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেও আমি জানি না আমার ভোট অন্য কেউ দিয়ে গেছে কিনা। ঘর থেকে বের হবার আগে চিন্তা করি রাতে কি অক্ষত দেহে এই ঘরে প্রবেশ করবো নাকি কয়লা। দুর্নীতি আগের চাইতে বেড়েছে। এই দেশের বাতাসও ঘুষ ছাড়া নড়ে না। অথচ, সিঙ্গাপুর? শুদ্ধ গণতন্ত্রের চর্চায় তারা পৃথিবীতে তিনে। দুর্নীতি নেই বললে চলে।
আমরা শেখ মুজিব বুঝি নাই। বুঝেছিলাম গণতন্ত্র। সিঙ্গাপুরের মানুষেরা গণতন্ত্র চায় নাই। চেয়েছিলো লি কুয়ান ইউকে। আজকে তাদের লি কুয়ান মারা গেছে। কিন্তু রয়ে গেছে শক্ত ভিতে দাঁড়ানো অর্থনীতি এবং গণতন্ত্র।
নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, শেখ মুজিবকে যারা খুন করেছিলো তারা মুখে বলেছিলো গণতন্ত্র এবং দুর্নীতির কথা। কিন্তু তারাই এই হত্যার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করেছিলো অদূর ভবিষ্যতেও যাতে বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতন্ত্রের চর্চা না হয়, দুর্নীতির সর্বগ্রাসী চেহারা যেন দিনে দিনে জমকালো হয়ে আমাদের গ্রাস করে নিচ্ছে। আজকে চারপাশে তাকাই আর হাহাকার করে বলি- হা শেখ মুজিব, হা জাতির পিতা! লি কুয়ান তার কাজ শেষ করে গেছে। তুমি পারনি। আমরা দেইনি। আজ আমরা নিষ্পাপেরাও তাই জীবন্ত নরকে জ্বলে পুড়ে মরছি।
- See more at: http://www.sahos24.com/2015/03/23/26788#sthash.wAB24R3n.dpuf
সিঙ্গাপুর স্বাধীনতা লাভ করে ৩১’শে আগষ্ট ১৯৬৩ সাল। কিন্তু ১৯৫৯ সাল থেকে তারা স্বাধিকার লাভ করে। আমাদের যেমন শেখ মুজিব তাদের তেমনি লি কুয়ান ইউ। তাকে অবশ্য শেখ মুজিবের মত জীবনের দুই দশক জেলে কাটাতে হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর ব্রিটিশরা একে একে তাদের উপনিবেশগুলো ত্যাগ করছিলো। । রাজনৈতিক ব্যাস্ততা এবং কর্মসুচি ছাড়া তাকে তেমন ঝামেলা পোহাতে হয়নি।
লি কুয়ান ১৯৫৯ সালে স্বাধিকার অর্জনের প্রথম দিনটি থেকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী। টানা ৩০ বছর শাসন করেছেন তিনি। গণতন্ত্র কি খায় না মাথায় দেয় তার শাসনামল শেষ হবার আগ পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের মানুষ জানতে পারেনি। তারা চেয়েছিলো বলেও মনে হয় না। মাঝেমধ্যে কিছু প্রতিবিপ্লবী এবং অতি বিপ্লবীরা গণতন্ত্র, ভোটের অধিকার চাইলেও তাদের ঠিকানা হয়েছে হয় মাটির তলে, নয়তো সমুদ্রে মাছের খাদ্য হয়ে অথবা লাল দালানের ভাত খেয়ে। সিঙ্গাপুর যখন স্বাধীনতা অর্জন করে তখন তার সম্পদ বলতে একটি সামুদ্রিক বন্দর এবং সামুদ্রিক মাছ। চরম  দরিদ্র অবস্থা। সে তুলনায় একাত্তরের যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ছিলো ঢের বেশী। হেনরি কিসিঞ্জার তখনকার বাংলাদেশকে বলেছিলেন তলাবিহীন ঝুড়ি। সিঙ্গাপুরের তলা দূরে থাক। ঝুড়িটাও ছিল না স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে।
স্বাধীনতার পরপর সিঙ্গাপুরের মানুষ বছরের পর বছর অভাব, কষ্ট সহ্য করেছে। সাথে ছিল ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া কলোনিয়াল সিস্টেমের উচ্ছিষ্ট। যার দরুন সুশাসন এবং দুর্নীতির প্রকোপ। ঠিক যেমনটা আমরা দেখেছি আমাদের জাতির স্বাধীনতার পরে। তাতে লি কুয়ান দমে যাননি। দমে যায়নি তার অনুসারীরাও। দাঁতে দাঁত চেপে প্রায় দুই দশকের পরিশ্রমে তারা দুর্নীতি, অভাব সবকিছুকে ঝাঁটাপেটা করে বিদায় করে। তিন দশকের মাথায় লি কুয়ান সিঙ্গাপুরকে পরিনত করেন এশিয়ার অন্যতম ধনী দেশ হিসেবে। এখন সিঙ্গাপুর মাথা পিছু আয়ের দিক থেকে পুরো পৃথিবীতে দ্বিতীয়। তাদের সমদ্র বন্দর বিশ্বের সবচাইতে ব্যাস্ততম বন্দর। তেল শোধনে সিঙ্গাপুর বাঘা বাঘা দেশকে পেছনে ফেলে তৃতীয়।
উল্টোদিকে, যদি আমাদের স্বাধীনতার পরের ইতিহাস দেখি তবে যেন শুরুটা একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। সেই অভাব, সেই দুর্নীতি আর সুশাসনের অভাব এবং কলোনিয়াল মানসিকতার যথেচ্ছাচার লুটপাট। আমাদের গল্পে অবশ্য স্বাধীনতা বিরোধীদের ভুমিকা আছে। যা সিঙ্গাপুরের গল্পে নেই। অতি বিপ্লবীরা অবশ্য ছিল। উনারা কবে কোথায় না ছিলেন। সিঙ্গাপুরের মানুষ জানতো লি কুয়ানের হাতে আলাদিনের চেরাগ নেই। শত বছরের শোষিত দেশের কাঠামো নতুন করে দাঁড় করাতে সময় লাগবে। তারা জানতো যে মানুষটা দেশের স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ, তিতীক্ষায় বিন্দুমাত্র অবহেলা করেননি তার চাইতে উপযুক্ত শাসক আর পাওয়া যাবে না। তাই লি কুয়ান যখন একদলীয় শাসন চালু করলেন যাবতীয় অবক্ষয় রোধে এবং বৃহত্তর স্বার্থে কেউ গণতন্ত্রের জন্য আমাদের মত স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে সুরে সুর মিলিয়ে মায়াকান্না করেনি।
লি কুয়ান যা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এর চাইতে উত্তম কাঠামো দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। সর্বদলীয়, সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহনে তৈরী করেছিলেন বাকশাল। তৎকালীন দ্বিতীয় বৃহত্তম দল সিপিবি হতে শুরু করে আরো অনেক দল যোগ দেয় তাতে। এমনকি অধুনা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান পর্যন্ত বাকশালের একজন গুরুত্বপুর্ন সদস্য ছিলেন। যদিও তার দলই পরবর্তীতে লুকিয়ে থাকা পরাজিত শক্তি এবং প্রাক্তন মুসলিম লীগারদের সাথে একত্রিত হয়ে নানা সময়ে বাকশালের নিন্দে-মন্দ করেছিলেন। এমনকি হাস্যকর হলেও সত্যি, এই সময়ে এসেও তারা সেই রাজনীতিটাই চালু রেখেছে।
লি কুয়ানের মানুষেরা গণতন্ত্র চায়নি। তারা আস্থা রেখেছিলো তাদের নেতার প্রতি। সন্তান যেমন আস্থা রাখে পিতার স্নেহ এবং ভালবাসার উপরে। অন্যদিকে আমাদের এখানে গণতন্ত্রের নামে কি-না হয়েছে। পাটের গুদামে আগুন হতে শুরু করে মানুষ খুন। এক সময়ে গণতন্ত্র উদ্ধার, দুর্নীতি মুক্ত করার নাম করে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলো খুনীরা। রেডিও’তে ঘোষনা আসলো- ফেরাউনের মৃত্যু হয়েছে। এবার আসমান থেকে আসমানী খাদ্যের মত করে উড়ে উড়ে ভাত ঘরে ঘরে ঢুকবে। ঘরে ঘরে হীরা, মানিক্য, মনি-মুক্তার বৃষ্টি বইবে। গণতন্ত্রের স্বর্নযুগ শুরু হবে। অথচ এই সেদিনও এক উত্তরাঞ্চলে মঙ্গায় মানুষ মারা গেছে অজস্র। কেউ একবার খোজও নেয়নি। যেন অনেকটাই মাথায় হাত বুলিয়ে...
এখন ২০১৫ সাল। শেখ মুজিবকে খুনের ৪০ বছর পার হয়ে যাবার পথে। হা হতোস্মি! ইলেকশনের দিন ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেও আমি জানি না আমার ভোট অন্য কেউ দিয়ে গেছে কিনা। ঘর থেকে বের হবার আগে চিন্তা করি রাতে কি অক্ষত দেহে এই ঘরে প্রবেশ করবো নাকি কয়লা। দুর্নীতি আগের চাইতে বেড়েছে। এই দেশের বাতাসও ঘুষ ছাড়া নড়ে না। অথচ, সিঙ্গাপুর? শুদ্ধ গণতন্ত্রের চর্চায় তারা পৃথিবীতে তিনে। দুর্নীতি নেই বললে চলে।
আমরা শেখ মুজিব বুঝি নাই। বুঝেছিলাম গণতন্ত্র। সিঙ্গাপুরের মানুষেরা গণতন্ত্র চায় নাই। চেয়েছিলো লি কুয়ান ইউকে। আজকে তাদের লি কুয়ান মারা গেছে। কিন্তু রয়ে গেছে শক্ত ভিতে দাঁড়ানো অর্থনীতি এবং গণতন্ত্র।
নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, শেখ মুজিবকে যারা খুন করেছিলো তারা মুখে বলেছিলো গণতন্ত্র এবং দুর্নীতির কথা। কিন্তু তারাই এই হত্যার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করেছিলো অদূর ভবিষ্যতেও যাতে বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতন্ত্রের চর্চা না হয়, দুর্নীতির সর্বগ্রাসী চেহারা যেন দিনে দিনে জমকালো হয়ে আমাদের গ্রাস করে নিচ্ছে। আজকে চারপাশে তাকাই আর হাহাকার করে বলি- হা শেখ মুজিব, হা জাতির পিতা! লি কুয়ান তার কাজ শেষ করে গেছে। তুমি পারনি। আমরা দেইনি। আজ আমরা নিষ্পাপেরাও তাই জীবন্ত নরকে জ্বলে পুড়ে মরছি।
- See more at: http://www.sahos24.com/2015/03/23/26788#sthash.wAB24R3n.dpuf